খিদে (Hunger)
খিদে
মহাকাশযান আকিলা ।
আকিলা দ্য ঈগ্ল ...
ছায়াপথের মধ্যে অবস্থিত দশ মহানক্ষত্রের এক সমষ্টির নামে মহাকাশযানটির নামকরণ।
আকিলা তে সওয়ার হয়ে অসীম মহাশূন্যে প্রবল বেগে ধেয়ে চলেছি আমরা। মহাকাশযানটির ভিতর কন্ট্রোল প্যানেল আর যন্ত্রপাতির মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।
বাইরেও প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা। মহাশূন্যে শব্দের অবস্থান থাকলেও প্রবাহ নেই - কারণ, শব্দ-প্রবাহের নেই কোন মাধ্যম। নিমেষের মধ্যে পিছনে মিলিয়ে
যাচ্ছে কোটি কোটি গ্রহতারকা, অ্যাস্টেরয়েড আর
ধূমকেতু। কিন্তু একই সাথে সামনে আর আশে পাশে আবির্ভূত হচ্ছে নতুন নক্ষত্র, নতুন সৌরমণ্ডলী । এ আদি অন্তহীন এক শূন্য। পৃথিবীর কক্ষপথ
ছেড়ে এসেছি সেই কবে! উজ্জ্বল বড় এক আলোকের গোলক থেকে ক্রমে ক্রমে সেটা গাঢ় নীল রং
নিয়ে অবশেষে এক দিন মিলিয়ে গেল আমার গোলক, আমার পৃথিবী ...
আমার দিশা-পথ নির্দিষ্ট নয়, আমার গন্তব্য
অনিশ্চিত । আমি চলেছি আকিলার খোলের মধ্যে চেপে অনির্দিষ্টর খোঁজে ...
ওই তো দেখতে পাচ্ছি কালপুরুষ ... ওই যে আর্সা মাইনর - সপ্তর্ষিমণ্ডল ! অবিকল, যেমন প্রফেসর জেম্স উইলিয়াম্স তাঁর বক্তৃতায় বর্ণনা
করেছিলেন। ওই তো পোলারিস্ জ্বলজ্বল করছে - ওই যে ডুভে ... আর ওই, একদম নীচে, ওটা নির্ঘাত মেরাক।
কোন অসুবিধাই হচ্ছে না চিনতে - মনে হচ্ছে ওরা আমার কত জন্মের বন্ধু!
আচমকা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি। মাধ্যাকর্ষণের মাত্রা অতি সামান্যই, তা সত্ত্বেও আমি ছিটকে গিয়ে পড়লাম আমার সহযাত্রী প্রফেসর
জেম্স উইলিয়াম্সের উপর। কিন্তু তিনিও ততক্ষণে আসন-চ্যুত । নিজেকে সামলানর সহজাত
তাগিদে সামনের কন্ট্রোল প্যানেলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। হঠাত্ হোল কি? আকিলা কি তাহলে কোন অ্যাস্টেরয়েড-এর সাথে ধাক্কা মেরেছে? অথবা কক্ষচ্যুত হয়েছে কোন কারণে ? নাকি কোন যান্ত্রিক গোলযোগ? আমি বুঝতে পারছি আমার শরীরটা এখন শূন্যে একটা গ্যাস বেলুনের মত ধাবিত হচ্ছে
স্বল্প পরিসর ওই ক্যাবিনের ঊর্ধ্বমুখে। নিজের ওপর কোন নিয়ন্ত্রণই নেই আমার। আমি
স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি পোর্ট-হোলের দরজার স্টিলের একটি বড়সড় লিভারের দিকে এগিয়ে
চলেছি আমি। আর কয়েক মুহুর্ত বাদেই ওই স্টিল লিভারটির সাথে আমার সংঘাত অনিবার্য -
অথচ আমার কোন ক্ষমতাই নেই নিজের ওই অনিয়ন্ত্রিত কক্ষপথ থেকে নিজেকে আলাদা করবার
...
এক সেকেন্ড - বড় জোর দুই ... ওই স্টিলের লিভারটি প্রবলভাবে এসে গুঁতো মারল
আমার পেটে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠলাম আমি...
ঘুম ভাঙতে টের পেলাম, এটা আমার ওই পুরনো
পেটের যন্ত্রণাটা । বুক আর উদরের সন্ধিস্থলের সেই পুরনো ফাঁপা খালি পেটের ব্যথা।
স্কুলের ডাক্তার আমায় পেট খালি রাখতে বারণ করেছিল... গতকাল রাতেও শুধু জল খেয়ে
শুয়ে পড়েছিলাম আমি। এটা আজকাল প্রায়ই হয়। বিশেষ করে মাসের শেষের দিকে।
ডালহৌসির এই স্কুলটাই আমার জগত । আমার বাবা এই স্কুলেই শিক্ষকতা করতেন। স্কুল
প্রাঙ্গণের মধ্যেই ছিল আমাদের বাসস্থান। মাকে হারিয়েছি সেই কবে - ছেলেবেলায়। দু
বছর আগে বাবাও চলে হঠাত্ চলে গেলেন। হার্ট অ্যাটাক। আচমকা। বাবাকে ঘিরেই ছিল আমার
জীবন। বাবাই ছিলেন আমার খেলার সাথী, আমার বন্ধু, আমার শিক্ষক। মাকে প্রায় পাইনি বললেই
চলে,
কিন্তু মায়ের অভাব কোনদিনও টের পাইনি। আমায় স্কুলে পাঠানো, অসুস্থাবস্থায় সময় ধরে ওষুধ খাওয়ান, আমার বন্ধুবান্ধব ডেকে ধুমধাম করে আমার জন্মদিনের কেক কাটা, স্কুল স্পোর্টসের জন্য আমাকে প্র্যাকটিস করানো, ক্লাস ডিবেটের জন্য আমাকে তৈরি করা - সবই করতেন বাবা। কোন
অভাব ছিল না আমার ...
অভাব আমার এখনো নেই। এ কথা ঠিক যে স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমি আর যোগ দিই
না - আমার জন্মদিনের কথাও আর মনে থাকে না কারো। স্কুল ক্যাম্পাসের ভিতরের সেই
সুন্দর কটেজটাও আর নেই। তা সত্ত্বেও একমাত্র বাবার উপস্থিতি ছাড়া আর কোন অভাব বোধ
আমার নেই।
বাব হঠাত্ চলে যাওয়াতে আমার পড়াশুনার ব্যাপারে সাময়িক সংকট একটা দেখা
দিয়েছিল। আমাদের এই স্কুলে পড়াশুনার খরচা আর পাঁচটা স্কুলের তুলনায় বেশ বেশীই।
বোর্ডিং-এ থেকে পড়লে আরও বেশী। বাবা মারা যাবার পর বাবার সহকর্মীরা - মানে
অন্যান্য স্যর আর মিস্-রা আসতেন। অনেক সহানুভূতি দেখাতেন। প্রথম প্রথম তো টিফিন
ক্যারিয়ারে খাবারও বানিয়ে আনতেন। তারপর একদিন এসেছিলেন প্রিন্সিপ্যাল - গোম্স
স্যর। খানিক সহানুভূতি জানানর পর একসময় জিজ্ঞেস করেছিলেন,
- তারপর, এখন কি করবে কিছু
ঠিক করলে?
মাথার ভিতর উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। তাইতো, এ কথাটা তো ভেবে দেখিনি, যে এখন কি করব !
এরকম সামান্য একটা প্রশ্নের উত্তর যে এত দুরহ হতে পারে আমার ধারনা ছিল না। তখন সবে
মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চ-মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিলাম - আমাদের স্কুলেই। ভেবে পেলাম না
কি বলব। মাথা নেড়েছিলাম - জানিনা।
- না, মানে, পড়াশুনায় তো তুমি ভালই, মাধ্যমিকেও বোর্ড র্যাংক পেয়েছ। এখানে থেকে পড়া চালিয়ে গেলে ফ্রি টিউশনের
ব্যবস্থা হয়ত আমি করে দিতে পারব। কিন্তু আনুষঙ্গিক খরচা-পাতিও তো বেশ ভালই। তোমার
থাকা,
খাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদের
কথা বলছি। এসব কী করে চলবে?
- স্যর ... আমি এইখানে আর থাকতে পারব না?
-না, মাই বয়, এটা স্টাফ কোয়ার্টার। তোমার বাবার, আই মিন তোমার স্বর্গীয় বাবার নামে অ্যালটেড ছিল। এখন তো এখন
তোমাকে এটা ছেড়ে দিতে হবে।
ভেবে পাচ্ছিলাম না কি বলব, তাই চুপ করে রইলাম।
গোম্স স্যর বলে চলেছিলেন,
- তোমার বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ডের যা অর্থ জমানো আছে - সব
তুমিই পাবে, কিন্তু সেতো তোমার এখানে থেকে
পড়াশুনা চালিয়ে যাবার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই এখন কী করবে একটু ভাল করে ভাবা দরকার।
... আচ্ছা, তোমার কোন আত্মীয় পরিজন নেই -
রিলেটিভস?
আমার এক দুঃসম্পর্কের কাকার কথা মাথায় এলো। বছর পাঁচেক আগে, ডালহৌসি তে এসে আমাদের সাথে দিন তিনেক ছিলেন। কিন্তু তিনি
এখন কথায় থাকেন, কী করেন - কোন বৃত্তান্তই আমার জানা
ছিল না। মাথা নাড়লাম - নেই।
মাথা কাজ করছিল না। এই স্কুল, লাইব্রেরি, খেলার মাঠ, কম্প্যুটার ল্যাব, বন্ধুবান্ধব, আমার স্যর, মিস্ - এ সব ছেড়ে আমায় চলে যাতে হবে, চিরতরে? এ কী করে সম্ভব!
গোম্স স্যর যাবার পরেও অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। সন্ধেবেলায় একা একা ঘরে
ভাল লাগছিল না। স্কুলের মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে যে রাস্তাটা সোজা মলের দিকে উঠে গেছে, সেটা ধরে হাঁটছিলাম - উদ্দেশ্যহীন ভাবে। হঠাত্ রামবাহাদুরের
সাথে দেখা। রামবাহাদুর আমাদের স্কুলের দরোয়ান। বাবাকে খুব মান্যিগন্যি করত। ওর
একটা ছেলে - ছোটু - তখন ক্লাস থ্রি তে পড়ত - কাছেই মিউনিসিপালিটির স্কুলে।
মাঝেমধ্যে ওর ছেলেটাকে নিয়ে আমাদের কোয়ার্টারে আসত। বাবা ওকে পড়াটড়া দেখিয়ে দিতেন।
কখনো-সখনো আমিও সাহায্য করতাম। বাবা মারা যাবার পর বাড়িতেও এসেছিল - এক কোণায়
দাঁড়িয়ে ছিল চুপটি করে।
- খোকাবাবু, শুনলাম আপনি নাকি
চলে যাবেন? হিন্দিতে জিজ্ঞেস করেছিল রামবাহাদুর।
কোথায় যাব তা এখনো কিছুই ভেবে উঠতে পারিনি, কিন্তু আমার চলে যাবার খবরটা কেমন করে যেন চাউর হয়ে গেছিল।
- গোম্স স্যর তো তাইই বললেন।
- কোথায় যাবেন? রিস্তেদার আছে কেউ?
মাথা নেড়েছিলাম। নেই।
- আমাদের একটা গার্ড হাউস্ খালি পড়ে আছে। খুবই ছোট, একটা মাত্র কামরা। একটু ভেঙ্গেভুঙ্গেও গেছে। ওইখেনে থাকতে
আপনার অসুবিধে হবে?
অসুবিধে? এতো প্রায় হাতে চাঁদ পাওয়া !
- কিন্তু আমাকে থাকতে দেবে কেন? পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম।
- আরে, আপনি একবার
প্রিন্সিপাল সাহেবের সাথে কথা বলেই দেখেন না। ভাড়া দিয়ে থাকবেন। উনি চাইলে কম
ভাড়ায় একটা কিছু ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। ওটা তো পড়েই আছে।
- ভাড়া? আমি ভাড়া দেব
কোত্থেকে?
আমার রোজগার কই?
- কেন, ছেলে পড়াবেন? আপনি এত ভাল ছাত্র, ছোট কেলাসের ছেলেপিলে পড়াতে পারবেন না? ছোটুকে দিয়ে শুরু করুন, দেখবেন ওই
মিনিউসিপালিটির স্কুলেরই অনেক বাচ্চা পেয়ে যাবেন। আজকাল তো বাচ্চা পড়িয়ে লোকে
প্রাসাদ গড়ে ফেলছে, আর আপনি আপনার
সামান্য খরচাপাতি চালাতে পারবেন না? আপনি কিছু ভাববেন না - আমি আপনাকে ছাত্র জোগাড় করে দেব আপনি কালই একবার গোম্স
সাহেবের সাথে কথা বলুন।
গোম্স স্যর রাজী না হতে-হতেও শেষমেশ রাজী হয়ে গেলেন। আমিও তার কিছুদিনের
মধ্যেই আমার নতুন বাসস্থানে, আমার যৎকিঞ্চিত
সম্বল-সামগ্রী নিয়ে আস্থানা গাড়লাম। রামবাহাদুরের সহায়তায় কয়েকজন ছাত্রও জুটে গেল
- ক্লাস থ্রি, ফোর, ফাইভ-এর। মাস গেলে দু-আড়াই হাজার টাকা আসতে লাগল। পাঁচশ টাকা চলে যেত বাড়ি
ভাড়ায় - বাকীটা আমার থাকত। চেষ্টা করলে আরও কিছু ছাত্র হয়তো আমার জুটত, কিন্তু আমার সময় ছিল না। স্কুলের পড়া ছাড়াও, বাইরের অনেক বিষয় আমাকে বিশেষ ভাবে টানত। গোম্স স্যর, প্রতিশ্রুতি মত স্কুলের টিউশন ফি মকুব করে দিয়েছিলেন - আমার
ভাল ফলাফলের সুবাদে। স্কুলের ল্যাব, লাইব্রেরি আর কম্প্যুটার ল্যাবে অনেকটা সময় কাটত আমার। ইন্টারনেটের মাধ্যমে
পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং গণিতের নানান তথ্য
অনায়াসেই জেনে নেওয়া যেত। জাগতিক এবং অতি-জাগতিক সবকিছু জেনে ফেলার এক সিং-দরজার
খোঁজ পেয়ে গেলাম আমি। এবং তার মাধ্যমেই, ভবিষ্যতে আমি কী করব, সে সম্বন্ধে একটা
সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়ে গেল আমার।
মহাকাশ ও তার গ্রহতারকা, তাদের কক্ষপথ, তাদের অভ্যুত্থান, বিনাশ - এই সব তথ্য বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট করত আমায়। আমেরিকা অ্যান্ড রাশিয়ার
স্পেস প্রোগ্রাম, বিশেষ করে ন্যাশনাল
এয়ারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন - নাসা - এর সমস্ত খবরাখবর, কর্মসূচী, গবেষণা ইত্যাদি -
যতটুকু সাধারণ জনগণের জন্য প্রকাশিত হত - তা সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণ অবগত হতে
থাকলাম। নাসা'র টেকনিক্যাল নিউজ ম্যাগাজিনের
অন-লাইন গ্রাহক হয়ে গেলাম। এর জন্য আমার কিছু পয়সা হয়তো খরচা হল - কিন্তু তাতে কী? আমার সামনে মহাজ্ঞানের যে সম্ভার খুলে গেল, তার তুলনায় ওই মূল্য নেহাতই নগণ্য। নাসা'র নিউজ ম্যাগাজিনের টেকনিক্যাল পেপার গুলো, এবং বিশেষজ্ঞদের মত-অভিমত - এই সব আমি গিলে খেতাম।
এই সময় একদিন ই-মেইল-এর মাধ্যমে, নাসা'র বিখ্যাত গবেষক - প্রফেসর জেম্স উইলিয়াম্স কে তাঁরই একটি
প্রকাশিত পেপার নিয়ে কতগুলো প্রশ্ন করেছিলাম। আশাতীতভাবে, উনি আমার মেইল-এর জবাব দিয়েছিলেন । দুটো বাদে, আমার বাকী প্রশ্নের উত্তর গুলোও দিয়েছিলেন । অকপটে স্বীকার
করেছিলেন যে দুটি প্রশ্নের উত্তর তাঁরও জানা নেই, তবে আমার এই প্রশ্নবাণে তিনি যারপরনাই সন্তুষ্ট, এবং ওনার সুযোগ সুবিধে মত সাহায্যও করবেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অবাক
হয়েছিলাম আমি। অত বড় একজন পণ্ডিত, কিন্তু কোন অহং
নেই। তারপর থেকে উনি আমার বন্ধু হয়ে গেলেন। ই-মেইল এর যোগাযোগটা থেকেই গেল। আর
আমার জীবনের আর একটা দরজা খুলে গেল হঠাত্। জ্যোতির্বিজ্ঞান - অ্যাস্ট্রোনমি -
নিয়ে আমার উৎসাহ দেখে প্রফেসর উইলিয়ামসই আমাকে উপদেশ দিলেন এবং স্বপ্ন দেখালেন
নভোপদার্থবিদ্যা বা অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার...
স্কুলের পড়াশুনা আর এত কিছু করে আমার সময় ছিল না বেশী ছাত্র পড়ানোর। মাঠ, খেলাধুলা - এইসব মুছে গেছিল আমার জীবন থেকে। তবে তার জন্যে
আমার কোন আক্ষেপ ছিল না। আমি যে আমার প্রিয় স্কুলে, আমার প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সান্নিধ্যে আমার পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম, সেটাই ছিল আমার কাছে অনেক বেশী।
শুধু একটাই সমস্যা মাঝে মধ্যেই আমাকে পীড়া দিত। খিদে। ভীষণ খিদে পেত। শুধু
খিদে পেত। খিদে পেলে যে পেট জ্বলে - বাবা বেঁচে থাকতে কখনো বুঝিনি। প্রথম প্রথম
বাবার অন্য সহকর্মীরা বাড়ি থেকে খাবার পাঠাতো - ক্রমে সেটা বন্ধ হয়ে গেল। আমার নতুন
আস্থানাতে, ঘরের এক কোণে, কেরোসিন স্টোভে রান্নার বন্দোবস্ত করে নিয়েছিলাম।
রামবাহাদুরের তত্ত্বাবধানে মোটামুটি রান্না-বান্নাও শিখে ফেললাম, এই ডাল-ভাত, ভাজাভুজি আর কি। তবে বেশীর ভাগ দিনই সন্ধেবেলায় রান্না করার সময় থাকত না।
ইচ্ছারও অভাব ছিল বোধ করি। যে গুটিকয়েক ছাত্র ছিল, তারা সন্ধেবেলাতেই আসত। তাদের পড়ানোর পর আমার মন টানত কম্প্যুটার ল্যাব।
সেখান থেকে ফিরতে অধিকাংশ দিনই রাত হত - তারপর আর রান্না করে খাবার ইচ্ছে থাকত না।
বাসি পাউরুটি চিবিয়ে, একপেট জল খেয়ে শুয়ে
পড়তাম।
একদিন পেটে ব্যথা শুরু হল। প্রথমে চিনচিনে। ভাবলাম - ও কিছু না - জল খেলেই ঠিক হয়ে যাবে ... ভুল ভেবেছিলাম। চিনচিনে ব্যথাটা
ক্রমেই এত বিকট হয়ে উঠল যে যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলাম। রাতে ঘুমোতে পারলাম না।
একসময় ব্যথাটা চলেও গেল। ভাবলাম ঠিক হয়ে গেছি। আবার ভুল। এরপর থেকে ব্যথাটা প্রায়ই
উঠতে লাগল। বিশেষ করে সকালের দিকে। পাউরুটি খেলে খানিক কমতো, তারপর খিদে বাড়লেই আবার থাবা বসাত।
স্কুল বোর্ডিং-এ নিজস্ব ডাক্তার ছিল। তাঁকে দেখালাম। ডাক্তারবাবু বললেন এ
ব্যথা খিদের। পেট খালি রাখা চলবে না কোনমতেই। রাখলেই বিপদ। ব্যথা তো বাড়বেই, বেশী বাড়াবাড়ি হলে প্রাণসংশয় পর্যন্ত হতে পারে। সময় ধরে
খাওয়া দরকার। আমার জন্যে খাওয়ার একটা চার্টও বানিয়ে দিলেন। ভারি বিরক্ত বোধ করলাম।
পড়াশুনা,
ছাত্র আর গবেষণা নিয়ে বেশ কাটছিল আমার দিন - এ আর এক উটকো
আপদ।
সময়ের অভাব তো ছিলই, মাসের কুড়ি তারিখ
পেরোতেই অর্থাভাবও প্রকট হত। এখনও বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমানো পুঁজির কিছুই আমি
পাইনি - ওটা পেলে সমস্যার একটু হয়তো হাল হত। কিছুদিন বৃথাই ওর পিছনে দৌড়াদৌড়ি
করেছি,
একে-ওকে ধরাধরি করেছি - কিছুতেই কিছু হয়নি। এখন হাল ছেরে
দিয়েছি - যখন হবার, হবে। আরও অন্তত
দু-তিন বছর। অবশ্য তাতেও আমার অসুবিধে হত না বিশেষ। আমাদের স্কুলের থেকে খানিকটা
নীচে নামলে একটা গুরদ্বারা আছে। সেখানে দুপুর-দুপুর বিনি পয়সায় লঙ্গর পাওয়া যায়।
দারুণ সুস্বাদু। ছুটির দিনে সাধারণত আমি ওইখানেই দিনের আহার সারি। এছাড়া ইস্কনের
একটা মন্দির আছে - তবে তার জন্যে মাইল পাঁচেক চড়াই-উৎরাই পথ ভাঙ্গতে হয়। সেখানেও সময়
মত পৌঁছতে পারলে খিচুরি ভোগ পাওয়া যায়।
কিছুদিন নিয়ম মেনে রান্না, গুরদ্বারা আর ইস্কনের
দৌলতে পেট ব্যথা হয়তো বা কিছু কমলো, কিন্তু আমার গবেষণার কাজে প্রভূত ক্ষতি হতে লাগল।
ইতিমধ্যে ই-মেইল মারফৎ আমি জানতে পারলাম যে নাসা খুব শীঘ্রিই একটি মহাকাশযান
পাঠানর প্রকল্প নিয়েছে। আজ অবধি পাঠানো সব মহাকাশযানের তুলনায় সর্বাধুনিক
প্রযুক্তি-তে বানান ওই যানটি হবে মনুষ্য চালিত। টানা তিন বছর মহাকাশে নিজস্ব
কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করার কর্মসূচী। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এটি পাঠাতে থাকবে অনেক
আলোকবর্ষ দূরে থাকা মহাকাশের বিরল সব নক্ষত্রমন্ডলীর ছবি এবং তথ্য। দু-জন মার্কিন
নভোচারী কে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ চলছে ... টানা তিন বছর এঁরা কাটাবেন
মহাকাশে ...
মহাকাশযানটির নাম আকিলা - দ্য ঈগ্ল... ।
আরও জানতে পারলাম, আমার গুরু, প্রফেসর জেম্স উইলিয়াম্স খুব শীঘ্রিই ভারতে আসছেন -
নয়াদিল্লি তে একটি সেমিনারে যোগ দিতে। দিন-ক্ষণ অবশ্য তখনো ঠিক হয়নি - হলে
জানাবেন।
প্রফেসর দিল্লি আসবেন!
ডালহৌসি থেকে দুদিনের জন্যে দিল্লি ঘুরে আসতে কত খরচা হবে? যাওয়া, আসা, থাকা, খাওয়া ... অবশ্য
দিল্লি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে রাত কাটালে কিছু টাকা বাঁচানো যেতে পারে ...
হঠাত্ কেন জানিনা মনে হল, আমাকে কিছু পয়সা
জমাতে হবে ...
ঘরে রান্না-বান্নার পাট উঠিয়ে দিলাম। মিছিমিছি সময় আর পয়সা নষ্ট করার মানে হয়
না। দুপুরবেলায় স্কুল থাকলেও এক ফাঁকে গিয়ে গুরদ্বারায় লঙ্গর খেয়ে আসতাম পেট পুরে।
সমস্যা হত রাতে। ইস্কনের মন্দিরটা বেশ দূরে। আর এখন এই জানুয়ারি মাসের শুরুতে
শীতটাও বেশ হাড় কাঁপানো। যে কোনদিন তুষারপাত শুরু হতে পারে। ছাত্র পড়িয়ে, কম্প্যুটার ল্যাব থেকে ফিরে ওই শীতে রাতে আর যেতে ইচ্ছে
করত না। তাই ফিরে গেলাম আবার পুরানো অভ্যেসে। বাতাসা আর জল খেয়ে শুয়ে পড়া। একবার
ঘুমিয়ে পড়লে কোন সমস্যা নেই...
পড়াশুনা আর গবেষণা নিয়ে বেশ কাটছিল সময়। প্রফেসর জেম্স এখনো তাঁর দিল্লি আসার
তারিখ জানাননি। এর মধ্যেই এই উৎপাত। স্বপ্নের মধ্যে দিব্যি আকিলাতে চেপে মহাকাশ
ভ্রমণ করছিলাম, হঠাত্ স্বপ্নের দুর্ঘটনাটা দিল সব
গড়বড় করে।
* * * * * * * *
আমার জ্ঞান ফিরল রামবাহাদুরের গলার
আওয়াজে। সঙ্গে আরও দুজন কে দেখতে পেলাম। বোর্ডিং এর ডাক্তার মেহতা আর গোম্স স্যর।
- এখন কেমন বোধ করছ? শুনতে পেলাম গোম্স স্যরের গলা।
ধরমরিয়ে উঠতে গিয়েই দেখলাম আমার বিছানার ধারে একটা স্ট্যান্ড, তাতে স্যালাইনের বোতল। আমাকে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে।
- উঠো না, উঠো না - ডাক্তার
মেহতা হাঁ হাঁ করে উঠলেন।
- আমার কী হয়েছিল? টের পেলাম আমার গলার স্বর কাঁপা কাঁপা এবং জড়ানো।
- তুমি তিন দিন অজ্ঞান ছিলে। আমাদের তো রীতিমত চিন্তায় ফেলে
দিয়েছিলে ভাই। রামবাহাদুর সময়মত খবর না দিলে একটা অনর্থ ঘটে যেত।
- আমার কী হয়েছিল? ফের জিজ্ঞাসা করলাম।
- তুমি খাও না? খিদে পায় না তোমার? বললেন গোম্স স্যর।
- পায় তো। খাইও তো। পেলেই খাই - মানে খিদে পেলেই খাই।
- এখন এক সপ্তাহ টানা বেড-রেস্ট। এই ওষুধ লিখে দিয়ে গেলাম। আর
রামবাহাদুর কিছু ফল আর দুধ কিনে রেখেছে। এগুলো খেয়ো।
এতক্ষণে নজরে পড়ল মাথার পাশে কিছু আপেল, কলা আর দুধের একটা টেট্রাপ্যাক্। রামবাহাদুর প্যাক থেকে খানিকটা দুধ ঢেলে
একটা গ্লাসে দিল। নিমরাজি হয়ে একটা ছোট্ট চুমুক দিলাম। দুধ খেতে আমার কোনকালেই ভাল
লাগে না। বাবা থাকতে এই একটা ব্যাপার নিয়ে বাবার সাথে আমার প্রায়শই মতের অমিল হত। কিন্তু
আজ দুধটুকু অমৃতর মত লাগল। প্রায় এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে ফেললাম। শরীরে একটু বলও
পেলাম মনে হল। অবশ্য এটা মানসিকও হতে পারে...
দিন সাতেক পরের ঘটনা। আমার স্যালাইন খুলে দেওয়া হয়েছে। কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘরের
মধ্যেই একটু আধটু হাঁটছি। রামবাহাদুর, জবরদস্তি আরও খাবার কিনে এনেছে আমার থেকে পয়সা নিয়ে। দিল্লি যাবার জন্য অতি
কষ্টে জমানো আমার পয়সা...
পেটের খিদেটা এখন নেই। তবে ঘরে একা বন্দী থেকে থেকে মনের খিদেটা বেড়ে গিয়েছে
চারগুণ। কতদিন কম্প্যুটারে নিজের মেইল দেখিনি। বিশ্বের চতুর্দিকে কত নতুন কিছু
ঘটে যাচ্ছে, আর আমি এখানে এক বৃদ্ধ রোগীর মত
জবুথুবু হয়ে দিন কাটাচ্ছি...
হঠাত্ মনে হল আমার এখুনি ঘর ছেড়ে বের হওয়া প্রয়োজন। কয়েকটা ওষুধও কিনতে হবে -
অবশ্য সেটা রামবাহাদুরও কিনে দিতে পারে। কিন্তু ও কি আমার হয়ে ই-মেইল দেখতে পারবে?
শীতটা জাঁকিয়ে পড়েছে। জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম পেঁজা তুলোর মত ঝরছে তুষার।
প্রায় প্রতি বছরই এই সময় ডালহৌসিতে তুষারপাত হয়। পর্যটকরা দূর-দূরান্ত থেকে আগে ভাগেই এসে ঘাঁটি গাড়ে আমার এই শৈল-নগরীতে -
কারণ একবার তুষারপাত শুরু হলে জনজীবনে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। সমতলে যাবার সমস্ত
বাস্ এবং ট্যাক্সি পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। কখনো আবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়ে
যায়। টানা তিন-চার দিন বিদ্যুৎ থাকেনা। জল জমে পাইপ ফেটে যায়। তখন নিজেকে গরম
রাখার একমাত্র উপায় উনুনে জল গরম করে বোতল বা হট্ব্যাগে সেঁক নেওয়া।
বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলাম বের হওয়ার পরিস্থিতি নেই। কিন্তু আমাকে যে বের হতেই
হবে?
আমার মনিব্যাগটায় দেখলাম হাজার দুয়েক টাকা এখনো অবশিষ্ট
আছে। বাবার হাতঘড়িতে দেখলাম, বিকেল চারটে - যদিও
বাইরে অন্ধকার। সৌভাগ্যবশত বিদ্যুৎ পরিষেবা এখনো বহাল; রাস্তার বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। আমাদের স্কুলের
কম্প্যুটার ল্যাব কি খোলা থাকবে না? থাকা তো উচিত, বোর্ডিং এর অনেক
ছাত্রই ঐ ল্যাব ব্যবহার করে দৈনন্দিন মেইল দেখার জন্য। আধুনিক জনজীবনে
খিদে-তেষ্টার পরই মানুষের প্রয়োজন ই-মেইল। আমার কোন মোবাইল ফোন নেই, তাই ঐ কম্প্যুটারই আমার মেইল দেখার একমাত্র মাধ্যম। ভাল করে
কম্বল মুড়ি দিয়ে, পায়ে গাম্-বুট টা
গলিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে আমার পায়ের গোড়ালি অবধি ডুবে গেল
সাদা,
নরম, তাজা তুষারে - গাম্বুট
আর মোজা ভেদ করে কনকনে ঠাণ্ডায় জমতে থাকল আমার পায়ের হাড়...
তুলতুলে বরফের মধ্যে দিয়ে হাঁটা বেশ কষ্টসাধ্য। আমার মাথা টলমল করছিল।
দুর্বলতার জন্য ঠাণ্ডাও বেশী লাগছিল বোধ করি...
কম্প্যুটারে ই-মেইল খুলেই আমার চক্ষুস্থির। প্রফেসর উইলিয়াম্সের তিন-তিনটে
মেইল ইন-বক্সে জমা আছে ! ঝটিতি, এক নিঃশ্বাসে
মেইলগুলি পড়ে ফেললাম...
প্রফেসর এখন ভারতে। গতকালই নয়াদিল্লি পৌঁছেছেন। নাসার বিভিন্ন কর্মসূচী এবং
মহাকাশ বিষয়ক গবেষণা নিয়ে তাঁর দু-দিন ব্যাপী বক্তৃতা - এক নামী হোটেলে। উনি আমাকে
বার বার করে যেতে লিখেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আমার উৎসাহ এবং আমার বেশ কিছু মতামত, তাঁকে বিশেষভাবে অভিভূত করেছে। উনি দিল্লিতে আমার সাথে দেখা
করতে ইচ্ছুক। প্রথম ই-মেইল টি সাতদিন আগের - অর্থাৎ যে সন্ধেবেলায় আমি অসুস্থ হয়ে
পড়ি,
সেদিনের। আমার উত্তর না পেয়ে তারপর দুদিন আমাকে আরও দুটো
মেইল পাঠিয়েছেন...
হিসেব করে দেখলাম, আগামী পরশু অবধি
প্রফেসর দিল্লিতে থাকবেন। এখান থেকে কোনমতে যদি পাঠানকোট পৌঁছতে পারি, তাহলে পরশু সকালের মধ্যে দিল্লি পৌঁছনো সম্ভব।
ডালহৌসিতে বরফ পরে দূরপাল্লার সব বাস্ পরিষেবা বন্ধ। এখান থেকে দশ কিলোমিটার
নিচে আর একটা বাস্ স্টেশন আছে। ওখানে সাধারণত তুষারপাত হয় না। ওখান থেকে কি পাওয়া
যাবে পাঠানকোটের বাস্ ?
ঘড়ি দেখলাম - বিকেল সাড়ে পাঁচটা। তুষারপাত চলেছে অবিশ্রান্ত। শুনশান রাস্তায়
বরফের আস্তরণ এখন গোড়ালির আরও ফুট-খানেক উপরে। কম্বল দিয়ে আর একবার নিজেকে ভালো
করে মুড়ে ফেললাম আমি। প্যান্টের হিপ-পকেটে রাখা মনিব্যাগটাতে হাত দিয়ে অনুভব করলাম
আমার শেষ সম্বল ... শীত করছে খুব, কিন্তু ম্যাজিকের
মত পেটের খিদেটা মিলিয়ে গেছে হঠাত্...
ভালোমন্দের বাছবিচার পরে করা যাবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের খিদে মেটানোর এইরকম
সুযোগ জীবনে আর হয়তো আসবে না...
যা থাকে কপালে - বলে বেরিয়ে পরলাম আমি, ক্রমাগত জমতে থাকা তুষার-গালিচা ভেদ করে সাদা রাস্তায় ... আমার কাছে সময় বড় কম
...
**********************
মাস্কাট
১ নভেম্বর ২০১৬

Comments
Post a Comment